পটলবাবু ফিল্মস্টার- সত্যজিৎ রায়
পটলবাবু সবে বাজারের থলিটা কাঁধে ঝুলিয়েছেন এমন সময় বাইরে থেকে নিশিকান্তবাবু হাঁক দিলেন, পটল আছ নাকি হে? আজ্ঞে হ্যাঁ। দাঁড়ান, আসছি। নিশিকান্ত ঘোষ মশাই নেপাল ভট্টচাজ্যি লেনে পটলবাবুর তিনখানা বাড়ির পরেই থাকেন। বেশ আমুদে লোক। পটলবাবু থলে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, কী ব্যাপার? সক্কাল সক্কাল? শোনো, তুমি ফিরছ কতক্ষণে? এই ঘণ্টাখানেক। কেন? তারপর আর বেরোনোর […]
পটলবাবু সবে বাজারের থলিটা কাঁধে ঝুলিয়েছেন এমন সময় বাইরে থেকে নিশিকান্তবাবু হাঁক দিলেন, পটল আছ নাকি হে? আজ্ঞে হ্যাঁ। দাঁড়ান, আসছি। নিশিকান্ত ঘোষ মশাই নেপাল ভট্টচাজ্যি লেনে পটলবাবুর তিনখানা বাড়ির পরেই থাকেন। বেশ আমুদে লোক। পটলবাবু থলে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন, কী ব্যাপার? সক্কাল সক্কাল? শোনো, তুমি ফিরছ কতক্ষণে? এই ঘণ্টাখানেক। কেন? তারপর আর বেরোনোর ব্যাপার নেই তো? আজ তো ট্যাগোরস বার্থডে। আমার ছোট শালার সঙ্গে কাল নেতাজি ফার্মেসিতে দেখা হল। সে ফিল্মে কাজ করে–লোকজন জোগাড় করে দেয়। বললে কী জানি একটা ছবির একটা সিনের জন্য একজন লোক দরকার। যেরকম চাইছে, বুঝেছ বছর পঞ্চাশ বয়স, বেঁটেখাটো, মাথায় টাক–আমার টক করে তোমার কথা মনে পড়ে গেল। তাই তোমার হদিস দিয়ে দিলুম। বলেছি সোজা তোমার সঙ্গে এসে কথা বলতে। আজ সকাল দশটা নাগাদ আসবে বলেছে। তোমার আপত্তি নেই তো? ওদের রেট হিসেবে কিছু পেমেন্টও দেবে অবিশ্যি… সক্কালবেলা ঠিক এই ধরনের একটা খবর পটলবাবু আশাই করেননি। বাহান্ন বছর বয়সে ফিল্মে অভিনয় করার প্রস্তাব আসতে পারে এটা তাঁর মতো নগণ্য লোকের পক্ষে অনুমান করা কঠিন বইকী! এ যে একেবারে অভাবনীয় ব্যাপার! কী হে, হ্যাঁ কি না বলে ফেলল। তুমি তো অভিনয়-টভিনয় করেছ এককালে, তাই না? হ্যাঁ, মানে না, বলার আর কী আছে? সে আসুক, কথাটথা বলে দেখি! কী নাম বললেন আপনার শালার? নরেশ। নরেশ দত্ত। বছর ত্রিশেক বয়স, লম্বা দোহারা চেহারা। দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ আসবে বলেছে। বাজার করতে গিয়ে আজ পটলবাবু গিন্নির ফরমাশ গুলিয়ে ফেলে কালোজিরের বদলে ধানিলঙ্কা কিনে ফেললেন। আর সৈন্ধব নুনের কথাটা তো বেমালুম ভুলেই গেলেন। এতে অবিশ্যি আশ্চর্য হবার কিছুই নেই। এককালে পটলবাবুর রীতিমতো অভিনয়ের শখ ছিল। শুধু শখ কেন–নেশাই বলা চলে। যাত্রায়, শখের থিয়েটারে, পুজোপার্বণে, পাড়ার ক্লাবের অনুষ্ঠানে তাঁর বাঁধা কাজ ছিল অভিনয় করা। হ্যান্ডবিলে কতবার নাম উঠেছে পটলবাবুর। একবার তো নীচের দিকে আলাদা করে বড় অক্ষরে নাম বেরুল–পরাশরের ভূমিকায় শ্রীশীতলাকান্ত রায় (পটলবাবু)। তাঁর নামে টিকিট বিক্রি হয়েছে। বেশি, এমনও সময় গেছে এককালে। তখন অবিশ্যি তিনি থাকতেন কাঁচরাপাড়ায়। সেখানেই রেলের কারখানায় চাকরি ছিল তাঁর। উনিশশো চৌত্রিশ সনে কলকাতার হাডসন অ্যান্ড কিম্বার্লি কোম্পানিতে আরেকটু বেশি মাইনের একটা চাকরি, আর নেপাল ভটচাজ্যি লেনে এই বাড়িটা পেয়ে পটলবাবু সস্ত্রীক কলকাতায় চলে আসেন। কটা বছর কেটেছিল ভালই। আপিসের সাহেব বেশ স্নেহ করতেন পটলবাবুকে। তেতাল্লিশ সনে পটলবাবু সবে একটা পাড়ায় থিয়েটারের দল গড়ব-গড়ব করছেন এমন সময় যুদ্ধের ফলে আপিসে হল ছাঁটাই, আর পটলবাবুর ন বছরের সাধের চাকরিটি কপূরের মতো উবে গেল। সেই থেকে আজ অবধি বাকি জীবনটা রোজগারের ধান্দায় কেটে গেছে পটলবাবুর। গোড়ায় একটা মনিহারি দোকান দিয়েছিলেন, সেটা বছর পাঁচেক চলে উঠে যায়। তারপর একটা বাঙালি আপিসে কেরানিগিরি করেছিলেন কিছুদিন, কিন্তু বড়কর্তা বাঙালি সাহেব মিস্টার মিটারের ঔদ্ধত্য আর অকারণ চোখ-রাঙানি সহ্য করতে না পারায় নিজেই ছেড়ে দেন সে চাকরি। তারপর এই দশটা বছর ইনসিওরেন্সের দালালি থেকে শুরু করে কী-না করেছেন পটলবাবু! কিন্তু যে-অভাব, যে-টানাটানি, সে আর দূর হয়নি কিছুতেই। সম্প্রতি তিনি একটা লোহালক্কড়ের দোকানে ঘোরাঘুরি করছেন; তাঁর এক খুড়তুতো ভাই বলেছে সেখানে একটা ব্যবস্থা করে দেবে। আর অভিনয়? সে তো যেন আর-এক জন্মের কথা! অজান্তে এক-একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে আবছা আবছা মনে পড়ে যায়, এই আর কি! নেহাত পটলবাবুর স্মরণশক্তি ভাল, তাই কিছু ভাল ভাল পার্টের ভাল ভাল অংশ এখনও মনে আছে!–শুন পুনঃপুনঃ গাণ্ডীবঝঙ্কার, স্বপক্ষ আকুল মহারণে। জিনি শত পবন-হুঙ্কার, পর্বত-আকার গদা করিছে ঝঙ্কার বৃকোদর সঞ্চালনে!…ও! ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। নরেশ দত্ত এলেন ঠিক সাড়ে বারোটার সময়। পটলবাবু প্রায় আশা ছেড়ে দিয়ে নাইতে যাবার তোড়জোড় করছিলেন, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। আসুন, আসুন! পটলবাবু দরজা খুলে আগন্তুককে প্রায় ঘরের ভিতর টেনে এনে তাঁর হাতল ভাঙা চেয়ারটি তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন–বসুন! , না। বসব না। নিশিকান্তবাবু আপনাকে আমার কথা বলেছেন বোধহয়… হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি অবিশ্যি খুবই অবাক হয়েছি। এতদিন বাদে… আপনার আপত্তি নেই তো? পটলবাবুর লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল। আমাকে দিয়ে…হেঁ হেঁ…মানে চলবে তো? নরেশবাবু গম্ভীরভাবে একবার পটলবাবুর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, বেশ চলবে। খুব চলবে। কাজটা কিন্তু কালই। কাল? রবিবার? হ্যাঁ…কোনও স্টুডিয়োতে নয় কিন্তু। জায়গাটা বলে দিচ্ছি আপনাকে। মিশন রো আর বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের মোড়ের ফ্যারাডে হাউসটা দেখেছেন তো? সাততলা বিল্ডিং একটা? সেইটের সামনে ঠিক সাড়ে-আটটায় পৌঁছে যাবেন। ওইখানেই কাজ। বারোটার মধ্যে ছুটি হয়ে যাবে আপনার। নরেশবাবু উঠে পড়লেন। পটলবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, কিন্তু পার্টটা কী বললেন না? পার্ট হল গিয়ে আপনার…একজন পেডেস্ট্রিয়ানের, মানে পথচারী আর কি! একজন অন্যমনস্ক, বদমেজাজি পেডেস্ট্রিয়ান।…ভাল কথা, আপনার গলাবন্ধ কোট আছে কি? তা আছে বোধহয়। ওটাই পরে আসবেন। ডার্ক রঙ তো? বাদামি গোছের। গরম কিন্তু। তা হোক না। আর আমাদের সিনটাও শীতকালের, ভালই হবে…কাল সাড়ে আটটা, ফ্যারাডে হাউস। পটলবাবুর ধাঁ করে আরেকটা জরুরি প্রশ্ন মাথায় এসে গেল। পাটটায় ডায়ালগ আছে তো? কথা বলতে হবে তো? আলবত। স্পিকিং পার্ট।…আপনি আগে অভিনয় করেছেন তো? হ্যাঁ…তা, একটু-আধটু…। তবে শুধু হেঁটে যাবার জন্য আপনার কাছে আসব কেন? সে তো রাস্তা থেকে যে-কোনও একটা পেডেস্ট্রিয়ান ধরে নিলেই হল।..ডায়ালগ আছে বইকী এবং সেটা কাল ওখানে গেলেই পেয়ে যাবেন। আসি… নরেশ দত্ত চলে যাবার পর পটলবাবু তাঁর গিন্নির কাছে গিয়ে ব্যাপারটা খুলে বললেন। যা বুঝছি বুঝলে গিন্নি-এ পার্টটা হয়তো তেমন একটা বড় কিছু নয়; অর্থপ্রাপ্তি অবিশ্যি আছে। সামান্য, কিন্তু সেটাও বড় কথা নয়। আসল কথা হচ্ছে, থিয়েটারে আমার প্রথম পার্ট কী ছিল মনে আছে তো? মৃত সৈনিকের পাট। স্রেফ হাঁ করে চোখ বুজে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা; আর তার থেকেই আস্তে আস্তে কোথায় উঠেছিলাম মনে আছে তো? ওয়াটস সাহেবের হ্যান্ডশেক মনে আছে? আর আমাদের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান চারু বিশ্বাসের দেওয়া সেই মডেল? আঁ? এ তো সবে সিঁড়ির প্রথম ধাপাকী বলো অ্যাঁ? মান যশ প্রতিপত্তি খ্যাতি, যদি বেঁচে থাকি ভবে, হে মোর গৃহিণী, এ সবই লভিৰ আমি।… পটলবাবু বাহান্ন বছর বয়সে হঠাৎ তিড়িং করে একটা লাফ দিয়ে উঠলেন। গিন্নি বললেন, করো কী? কিচ্ছু ভেবো না গিন্নি। শিশির ভাদুড়ি সত্তর বছর বয়সে চাণক্যের পার্টে কী লাফখানা দিতেন মনে আছে? আজ যে পুনর্যৌবন লাভ করেছি। গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল! সাধে কি তোমার কোনওদিন কিচ্ছু হয় না? হবে হবে! সব হবে! ভাল কথা–আজ বিকেলে একটু চা খাব, বুঝেছ? আর সঙ্গে একটু আদার রস, নইলে গলাটা ঠিক.. . পরদিন সকালে মেট্রোপলিটান কোম্পানির ঘড়িতে যখন আটটা বেজে সাত মিনিট তখন পটলবাবু এসপ্ল্যানেডে এসে পৌঁছলেন। সেখান থেকে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট ও মিশন রো-এর ফ্যারাডে হাউসে পৌঁছতে লাগল আর মিনিট দশেক। বিরাট তোড়জোড় চলেছে আপিসের গেটের সামনে। তিন-চারখানা গাড়ি, তার একটা বেশ বড় প্রায় বাস-এর মতো–তার মাথায় আবার সব জিনিসপত্তর। রাস্তার ঠিক ধারটায় ফুটপাথের উপর একটা তেপায়া কালো যন্ত্রের মতো জিনিস; তার পাশে কয়েকজন লোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। গেটের ঠিক মুখটাতে একটা তেপায়া লোহার ডাণ্ডার মাথায় আরেকটা লোহার ডাণ্ডা আড়াআড়িভাবে শোয়ানো রয়েছে, আর তার ডগা থেকে ঝুলছে একটা মৌমাছির চাকের মতো দেখতে জিনিস। এ ছাড়া ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে জনা ত্রিশেক লোক, যাদের মধ্যে অবাঙালিও লক্ষ করলেন পটলবাবু; কিন্তু এদের যে কী কাজ সেটা ঠাহর করতে পারলেন না। কিন্তু নরেশবাবু কোথায়? একমাত্র তিনি ছাড়া তো পটলবাবুকে কেউই চেনেন না! দুরুদুরু বুকে পটলবাবু এগিয়ে চললেন আপিসের গেটের দিকে। বৈশাখ মাস; গলাবন্ধ খদ্দরের কোটটা গায়ে বেশ ভারী বোধ হচ্ছিল। গলার কলারের চারপাশ ঘিরে বিন্দু বিন্দু ঘাম অনুভব করলেন পটলবাবু। এই যে অতুলবাবু–এদিকে! অতুলবাবু? পটলবাবু ঘুরে দেখেন আপিসের বারান্দায় একটা থামের পাশে দাঁড়িয়ে নরেশবাবু তাঁকেই ডাকছেন। নামটা ভুল করেছেন ভদ্রলোক। অস্বাভাবিক নয়। একদিনের আলাপ তো! পটলবাবু এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করে বললেন, আমার নামটা বোধহয় ঠিক নোট করা নেই আপনার। শ্রীশীতলাকান্ত রায়। অবিশ্যি পটলবাবু বলেই জানে সকলে। থিয়েটারেও ওই নামেই জানত। ও। তা আপনি তো বেশ পাংচুয়াল দেখছি। পটলবাবু মৃদু হাসলেন। ন বছর হাডসন কিম্বার্লিতে চাকরি করেছি; লেট হইনি একদিনও। নট এ সিঙ্গল ডে। বেশ, বেশ। আপনি এক কাজ করুন। ওই ছায়াটায় গিয়ে একটু ওয়েট করুন। আমরা এদিকে একটু কাজ এগিয়ে নিই। তেপায়া যন্ত্রটার পাশ থেকে একজন বলে উঠল, নরেশ! সার? উনি কি আমাদের লোক? হ্যাঁ স্যার। ইনিই..মানে, ওই ধাক্কার ব্যাপারটা… ও। ঠিক আছে। এখন জায়গাটা ক্লিয়ার করো তো; শট নেব। পটলবাবু আপিসের পাশেই একটা পানের দোকানের ছাউনির তলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বায়স্কোপ তোলা তিনি এর আগে কখনও দেখেননি। তাঁর কাছে সবই নতুন। থিয়েটারের সঙ্গে কোনও মিলই তো নেই। আর কী পরিশ্রম করে লোকগুলো। ওই ভারী যন্ত্রটাকে পিঠে করে নিয়ে এখান থেকে ওখানে রাখছে একটি একুশ-বাইশ বছরের ছোঁকরা। বিশ-পঁচিশ সের ওজন তো হবেই যন্ত্রটার। কিন্তু তাঁর ডায়ালগ কই? আর তো সময় নেই বেশি। অথচ এখনও তাঁকে যে কী কথা বলতে হবে তাই জানেন না পটলবাবু। হঠাৎ যেন একটু নার্ভাস বোধ করলেন পটলবাবু। এগিয়ে যাবেন নাকি? ওই তো নরেশবাবু; একবার তাঁকে গিয়ে বলা উচিত নয় কি? পার্ট ছোটই হোক আর বড়ই হোক, ভাল করে করতে হলে তাঁকে তো তৈরি করতে হবে সে পার্ট! না হলে এতগুলো লোকের সামনে তাঁকে যদি কথা গুলিয়ে ফেলে অপদস্থ হতে হয়? আজ প্রায় বিশ বচ্ছর অভিনয় করা হয়নি যে! পটলবাবু এগিয়ে যেতে গিয়ে একটা চিৎকার শুনে থমকে গেলেন। সাইলেন্স! তারপর নরেশবাবুর গলা পাওয়া গেল–এবার শট নেওয়া হবে! আপনারা দয়া করে একটু চুপ করুন। কথাবার্তা বলবেন না, জায়গা ছেড়ে নড়বেন না, ক্যামেরার দিকে এগিয়ে আসবেন না! তারপর আবার সেই প্রথম গলায় চিৎকার এল-সাইলেন্স! টেকিং। এবার পটলবাবু লোকটিকে দেখতে পেলেন। মাঝারি গোছের মোটাসোটা ভদ্রলোকটি তেপায়া যন্ত্রটার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন; গলায় একটা চেন থেকে দুরবিনের মতো একটা জিনিস ঝুলছে। ইনিই কি পরিচালক নাকি? কী আশ্চর্য, পরিচালকের নামটাও যে তাঁর জেনে নেওয়া হয়নি। এবারে পর পর আরও কতগুলো চিৎকার পটলবাবুর কানে এল–স্টার্ট সাউন্ড! রানিং! অ্যাকশন! অ্যাকশন কথাটার সঙ্গে সঙ্গেই পটলবাবু দেখলেন চৌমাথার কাছ থেকে একটা গাড়ি এসে আপিসের সামনে থামল, আর তার থেকে একটি মুখে-গোলাপি-রঙ-মাখা স্যুট-পরা যুবক দরজা খুলে প্রায় হুমড়ি খেয়ে নেমে হনহনিয়ে আপিসের গেট পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেল। পরক্ষণেই পটলবাবু চিৎকার শুনলেন কাট, আর অমনই সাইলেন্স ভেঙে গিয়ে জনতার গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। পটলবাবুর পাশেই এক ভদ্রলোক তাঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন, ছোঁকরাটিকে চিনলেন তো? পটলবাবু বললেন, কই, না তো। ভদ্রলোক বললেন, চঞ্চলকুমার। তরতরিয়ে উঠছে ছোঁকরা। একসঙ্গে চারখানা বইয়ে অভিনয় করছে। পটলবাবু বায়স্কোপ খুবই কম দেখেন, কিন্তু এই চঞ্চলকুমারের নাম যেন শুনেছেন দু-একবার। কটিবাবু বোধহয় এই ছেলেটিরই প্রশংসা করছিলেন একদিন। বেশ মেক-আপ করেছে ছেলেটি! ওই বিলিতি স্যুটের বদলে ধুতি চাদর পরিয়ে ময়ুরের পিঠে চড়িয়ে দিলেই একেবারে কার্তিক ঠাকুর। কাঁচড়াপাড়ায় মনোতোষ ওরফে চিনুর চেহারা কতকটা ওইরকমই ছিল বটে; বেড়ে ফিমেল পার্ট করত চিনু! পটলবাবু এবার পাশের ভদ্রলোকটির দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বললেন, আর পরিচালকটির নাম কী মশাই? ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, সে কী, আপনি তাও জানেন না? উনি যে বরেন মল্লিক–তিনখানা ছবি পর পর হিট করেছে। যাক। কতগুলো দরকারি জিনিস জানা হয়ে গেল। নইলে গিন্নি যদি জিজ্ঞেস করতেন কার ছবিতে কার সঙ্গে অভিনয় করে এলে, তা হলে মুশকিলেই পড়তেন পটলবাবু। নরেশ একভাঁড় চা নিয়ে পটলবাবুর দিকে এগিয়ে এল। আসুন স্যার, গলাটা একটু ভিজিয়ে আলগা করে নিন। আপনার ডাক পড়ল বলে! পটলবাবু এবার আসল কথাটা না বলে পারলেন না। আমায় ডায়ালগটা যদি এই বেলা দিতেন তো– ডায়ালগ? আসুন আমার সঙ্গে। নরেশ তেপায়া যন্ত্রটার দিকে এগিয়ে গেল, পিছনে পটলবাবু। এই শশাঙ্ক। একটি হাফশার্ট-পরা ছোঁকরা এগিয়ে এল নরেশের দিকে। নরেশ তাকে বলল, এই ভদ্রলোক ওঁর ডায়ালগ চাইছেন। একটা কাগজে লিখে দে তো। সেই ধাক্কার ব্যাপারটা… শশাঙ্ক পটলবাবুর দিকে এগিয়ে এল। আসুন দাদু…এই জ্যোতি, তোর কলমটা একটু দে তো! দাদুকে ডায়ালগটা দিয়ে দিই। জ্যোতি ছেলেটি তার পকেট থেকে একটা লাল কলম বার করে শশাঙ্কর দিকে এগিয়ে দিল। শশাঙ্ক তার হাতের খাতা থেকে একটা সাদা পাতা ছিঁড়ে কলম দিয়ে তাতে কী জানি লিখে কাগজটা পটলবাবুকে দিল। পটলবাবু কাগজটার দিকে চেয়ে দেখলেন তাতে লেখা রয়েছে–আঃ! আঃ? পটলবাবুর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল। কোটটা খুলে ফেলতে পারলে ভাল হয়। গরম হঠাৎ অসহ্য হয়ে উঠেছে। শশাঙ্ক বলল, দাদু যে গুম মেরে গেলেন? কঠিন মনে হচ্ছে? এরা কি তা হলে ঠাট্টা করছে? সমস্ত ব্যাপারটাই কি একটা বিরাট পরিহাস? তাঁর মতো নিরীহ নিৰ্বিাদী মানুষকে ডেকে এনে এতবড় শহরের এতবড় রাস্তার মাঝখানে ফেলে রঙতামাশা? এত নিষ্ঠুরও কি মানুষ হতে পারে? পটলবাবু শুকনো গলায় বললেন, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। কেন বলুন তো? শুধু আঃ? আর কোনও কথা নেই? শশাঙ্ক চোখ কপালে তুলে বলল, বলেন কী দাদু? এ কি কম হল নাকি? এ তো রেগুলার স্পিকিং পার্ট! বরেন মল্লিকের ছবিতে স্পিকিং পার্ট–আপনি বলছেন কী? আপনি তো ভাগ্যবান লোক মশাই! জানেন, আমাদের এই ছবিতে আজ অবধি প্রায় দেড়শো লোক পার্ট করে গেছে যারা কোনও কথাই বলেনি। শুধু ক্যামেরার সামনে দিয়ে হেঁটে গেছে। অনেকে আবার হাঁটেওনি, স্রেফ দাঁড়িয়ে থেকেছে। কারুর কারুর মুখ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আজকেও দেখুন না–এই যে ওঁরা সব দাঁড়িয়ে আছেন, ল্যাম্পপোস্টের পাশে; ওঁরা সবাই আছেন আজকের সিনে, কিন্তু একজনেরও একটিও কথা নেই। এমনকী আমাদের যে নায়ক চঞ্চলকুমারতারও আজ কোনও ডায়ালগ নেই। কেবলমাত্র আপনার কথা, বুঝেছেন? এবার জ্যোতি বলে ছেলেটি এগিয়ে এসে পটলবাবুর কাঁধে হাত রেখে বলল, শুনুন দাদু ব্যাপারটা বুঝে নিন। চঞ্চলকুমার হলেন এই আপিসের বড় চাকুরে। সিনটায় আমরা দেখাচ্ছি যে আপিসে একটা ক্যাশ ভাঙার খবর পেয়ে উনি হন্তদন্ত হয়ে এসে দৌড়ে আপিসে ঢুকছেন। ঠিক সেই সময় সামনে পড়ে গেছেন আপনি একজন পেডেস্ট্রিয়ানবুঝেছেন? লাগছে ধাক্কা-বুঝেছেন? আপনি ধাক্কা খেয়ে বলছেন আঃ, আর চঞ্চল আপনার দিকে দৃকপাত না করে ঢুকে যাচ্ছে আপিসে। আপনাকে অগ্রাহ্য করাতে তার মানসিক অবস্থাটা ফুটে বেরুচ্ছে বুঝেছেন? ব্যাপারটা কত ইম্পর্ট্যান্ট ভেবে দেখুন! এবার শশাঙ্ক এগিয়ে এসে বলল, শুনলেন তো? যান, এবার একটু ওদিকটায় যান দিকি! এদিকটায় ভিড় করলে কাজের অসুবিধা হবে। আরেকটা শট আছে, তারপর আপনার ডাক পড়বে। পটলবাবু আস্তে আস্তে আবার পানের দোকানটার দিকে সরে গেলেন। ছাউনির তলায় পৌঁছে হাতের কাগজটার দিকে আড়দৃষ্টিতে দেখে, আশেপাশের কেউ তাঁর দিকে দেখছে কি না দেখে কাগজটা কুণ্ডলী পাকিয়ে নর্দমার দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আঃ! একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস পটলবাবুর বুকের ভিতর থেকে উপরে উঠে এল। শুধু একটিমাত্র কথাকথাও না, শব্দ–আঃ! গরম অসহ্য হয়ে আসছে। গায়ের কোটটার মনে হয় যেন মনখানেক ওজন। আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে; পা অবশ হয়ে গেছে। পটলবাবু এগিয়ে গিয়ে পানের দোকানের ওদিকের আপিসটার দরজার সিঁড়ির উপর বসে পড়লেন। সাড়েনটা বাজে। করালীবাবুর বাড়িতে শ্যামাসংগীত হয় রবিবার সকালে; পটলবাবু নিয়মিত গিয়ে শোনেন। বেশ লাগে। সেইখানেই যাবেন নাকি চলে? পেলে ক্ষতিটা কী? এইসব বাজে, খেলো লোকের সংসর্গে রবিবারের সকালটা মাটি করে লাভ আছে কিছু? আর অপমানের বোঝাটাও যে বইতে হবে সেইসঙ্গে। সাইলেন্স! দুর! নিকুচি করেছে তোর সাইলেন্সের। যানা কাজ, তার বত্রিশ গুণ ফুটুনি আর ভড়ং। আর চেয়ে থিয়েটারের কাজ– থিয়েটার…থিয়েটার… অনেককাল আগের একটা ক্ষীণ স্মৃতি পটলবাবুর মনের মধ্যে জেগে উঠল। একটা গম্ভীর সংযত অথচ সুরেলা কণ্ঠস্বরে বলা কতগুলো অমূল্য উপদেশের কথা–একটা কথা মনে রেখো পটল। যত ছোট পার্টই তোমাকে দেওয়া হোক, তুমি জেনে রেখো তাতে কোনও অপমান নেই। শিল্পী হিসেবে তোমার কৃতিত্ব হবে সেই ছোট্ট পার্টটি থেকেও শেষ রসটুকু নিংড়ে বার করে তাকে সার্থক করে তোলা। থিয়েটারের কাজ হল পাঁচজনে মিলেমিশে কাজ। সকলের সাফল্য জড়িয়েই নাটকের সাফল্য। পাকড়াশি মশাই দিয়েছিলেন এ উপদেশ পটলবাবুকে। গগন পাকড়াশি। পটলবাবুর নাট্যগুরু ছিলেন তিনি। আশ্চর্য অভিনেতা ছিলেন গগন পাকড়াশি, অথচ দম্ভের লেশমাত্র ছিল না তাঁর মনে। ঋষিতুল্য মানুষ আর শিল্পীর সেরা শিল্পী। আরও একটা কথা বলতেন পাকড়াশি মশাই-নাটকের এক-একটি কথা হল এক-একটি গাছের ফল। সবাই নাগাল পায় না সে-ফলের। যারা পায় তারাও হয়তো তার খোসা ছাড়াতে জানে না। কাজটা আসলে হল তোমার–অভিনেতার। তোমাকে জানতে হবে কী করে সে ফল পেড়ে তার খোসা ছাড়িয়ে তার থেকে রস নিংড়ে বার করে সেটা লোকের কাছে পরিবেশন করতে হয়। গগন পাকড়াশির কথা মনে হতে পটলবাবুর মাথা আপনা থেকেই নত হয়ে এল। সত্যিই কি তাঁর আজকের পার্টটার মধ্যে কিছুই নেই? একমাত্র কথা তাঁকে বলতে হবে–আঃ। কিন্তু একটি কথা বলেই কি এককথায় তাকে উড়িয়ে দেওয়া যায়? আঃ, আঃ, আঃ, আঃ, আঃ–পটলবাবু বারবার নানান সুরে কথাটাকে আওড়াতে লাগলেন। আওড়াতে আওড়াতে ক্রমে তিনি একটি আশ্চর্য জিনিস আবিষ্কার করলেন। ওই আঃ কথাটাই নানান সুরে নানান ভাবে বললে মানুষের মনের নানান অবস্থা প্রকাশ করছে। চিমটি খেলে মানুষে যেভাবে আঃ বলে, গরমে ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে মোটেই সেভাবে আঃ বলে না। এ দুটো আঃ একেবারে আলাদা রকমের; আবার আচমকা কানে সুড়সুড়ি খেলে বেরোয় আরও আরেক রকম আঃ। এ ছাড়া আরও কতরকম আঃ রয়েছে–দীর্ঘশ্বাসের আঃ, তাচ্ছিল্যের আঃ, অভিমানের আঃ, ছোট করে বলা আঃ, লম্বা করে বলা আ, চেঁচিয়ে বলা আঃ, মৃদুস্বরে আঃ, চড়া গলায় আঃ, খাদে গলায় আঃ, আবার আ-টাকে খাদে শুরু করে বিসর্গটায় সুর চড়িয়ে আঃ–আশ্চর্য। পটলবাবুর মনে হল তিনি যেন ওই একটি কথা নিয়ে একটা আস্ত অভিধান লিখে ফেলতে পারেন। এত নিরুৎসাহ হচ্ছিলেন কেন তিনি? এই একটা কথা যে একেবারে সোনার খনি। তেমন তেমন অভিনেতা তো এই একটা কথাতেই বাজিমাত করে দিতে পারে। সাইলেন্স! পরিচালক মশাই ওদিকে আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠেছেন। পটলবাবু দেখলেন জ্যোতি ছোঁকরাটি তাঁর কাছেই ভিড় সরাচ্ছে। ছোঁকরাকে একটা কথা বলা দরকার। পটলবাবু দ্রুতপদে এগিয়ে গেলেন তার কাছে। আমার কাজটা হতে আর কতক্ষণ দেরি ভায়া? অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন দাদু? একটু ধৈর্য ধরতে হয় এসব ব্যাপারে। আরও আধ ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করুন। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। অপেক্ষা করব বইকী! আমি এই কাছাকাছিই আছি। দেখবেন, আবার সটকাবেন না যেন। জ্যোতি চলে গেল। স্টার্ট সাউন্ড। পটলবাবু পা টিপে টিপে শব্দ না করে রাস্তা পেরিয়ে উলটো দিকের একটা নিরিবিলি গলিতে ঢুকে পড়লেন। ভালই হল। হাতে সময় পাওয়া গেছে কিছুটা! এরা যখন রিহার্সাল-টিহার্সালের বিশেষ ধার ধারছে না, তখন তিনি নিজেই নিজের অংশটা অভ্যাস করে নেবেন। গলিটা নির্জন। একে আপিসপাড়া বাসিন্দা এমনিতেই কম–তায় রবিবার। যে কজন লোক ছিল সবাই ফ্যারাডে হাউসের দিকে বায়স্কোপের তামাশা দেখতে চলে গেছে। পটলবাবু গলা খাঁকরে নিয়ে আজকের এই বিশেষ দৃশ্যের বিশেষ আঃশব্দটি আয়ত্ত করতে আরম্ভ করলেন। আর সেইসঙ্গে আচমকা ধাক্কা খেলে মুখটা কীরকম বিকৃত হতে পারে, হাতদুটো কতখানি বেঁকে কীরকম ভাবে চিতিয়ে উঠতে পারে, আঙুলগুলো কতখানি ফাঁক হতে পারে, আর পায়ের অবস্থা কীরকম হতে পারে–এই সবই একটা কাঁচের জানলায় নিজের ছায়া দেখে ঠিক করে নিতে লাগলেন। ঠিক আধঘণ্টা পরেই পটলবাবুর ডাক পড়ল; এখন আর তাঁর মনে কোনও নিরুৎসাহের ভাব নেই। উদ্বেগও কেটে গেছে তাঁর মন থেকে। রয়েছে কেবল একটা চাপা উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ; পঁচিশ বছর আগে স্টেজে অভিনয় করার সময় একটা বড় দৃশ্যে নামবার আগে যে ভাবটা তিনি অনুভব করতেন, সেই ভাব। পরিচালক বরেন মল্লিক পটলবাবুকে কাছে ডেকে বললেন, আপনি ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছেন তো? আজ্ঞে হ্যাঁ। বেশ। আমি প্রথম বলব স্টার্ট সাউন্ড। তার উত্তরে ভেতর থেকে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট বলবে রানিং। বলামাত্র ক্যামেরা চলতে আরম্ভ করবে। তারপর আমি বলব অ্যাকশন! বললেই আপনি ওই থামের কাছটা থেকে এইদিকে হেঁটে আসতে শুরু করবেন, আর নায়ক এই গাড়ির দরজা থেকে যাবে ওই আপিসের গেটের দিকে। আন্দাজ করে নেবেন যাতে ফুটপাথের এইরকম জায়গাটায় কলিশনটা হয়। নায়ক আপনাকে অগ্রাহ্য করে ঢুকে যাবে আপিসে, আর আপনি বিরক্ত হয়ে আঃ বলে আবার হাঁটতে শুরু করবেন। কেমন? পটলবাবু বললেন, একটা রিহার্সাল…? না, বরেনবাবু বাধা দিলেন। মেঘ করে আসছে মশাই। রিহার্সালের টাইম নেই। রোদ থাকতে থাকতে নেওয়া দরকার শটটা। কেবল একটা কথা… আবার কী? গলিতে রিহার্সাল দেবার সময় পটলবাবুর একটা আইডিয়া মাথায় এসেছিল, সেটা সাহস করে বলে ফেললেন। আমি ভাবছিলাম–ইয়ে, আমার হাতে যদি একটা খবরের কাগজ থাকে, আর আমি যদি সেটা পড়তে পড়তে ধাক্কাটা খাই..মানে, অন্যমনস্কতার ভাবটা ফুটিয়ে তুলতে– বরেন মল্লিক তাঁর কথাটা শেষ না হতেই বলে উঠলেন, বেশ তো…ও মশাই, আপনার যুগান্তরটা এই ভদ্রলোককে দিন তো…হ্যাঁ। এইবার এই থামের পাশে আপনার জায়গায় গিয়ে রেডি হয়ে যান। চঞ্চল, তুমি রেডি? গাড়ির পাশ থেকে নায়ক উত্তর দিলেন, ইয়েস স্যার। গুড। সাইলেন্স। বরেন মল্লিক হাত তুললেন, তারপর হঠাৎ তক্ষুনি হাত নামিয়ে নিয়ে বললেন, ওহো-হো, এক মিনিট। কেষ্ট, ভদ্রলোককে একটা গোঁফ দিয়ে দাও তো চট করে। ক্যারেক্টারটা পুরোপুরি আসছে না। কীরকম গোঁফ স্যার? ঝুঁপো, না চাড়া-দেওয়া, না বাটারফ্লাই? রেডি আছে সবই। বাটারফ্লাই, বাটারফ্লাই। চট করে দাও, দেরি কোরো না। একটি কালো বেঁটে ব্যাকব্রাশ করা ছোঁকরা পটলবাবুর দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতের একটা টিনের বাক্স থেকে একটা ছোট্ট চৌকো কালো গোঁফ বার করে আঠা লাগিয়ে পটলবাবুর নাকের নীচে সেঁটে দিল। পটলবাবু বললেন, দেখো বাপু, ধাক্কাধাক্কিতে খুলে যাবে না তো? ছোঁকরা হেসে বলল, ধাক্কা কেন? আপনি দারা সিং-এর সঙ্গে কুস্তি করুন না–তাও খুলবে না। লোকটার হাতে আয়না ছিল, পটলবাবু টুক করে তাতে একবার নিজের চেহারাটা দেখে নিলেন। সত্যিই তো! বেশ মানিয়েছে তো! খাসা মানিয়েছে। পটলবাবু পরিচালকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে মনে মনে তারিফ না করে পারলেন না। সাইলেন্স! সাইলেন্স! পটলবাবুর গোঁফ পরা দেখে দর্শকদের মধ্যে থেকে একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, বরেন মল্লিকের হুঙ্কারে সেটা থেমে গেল। পটলবাবু লক্ষ করলেন সমবেত জনতার বেশিরভাগ লোকই তাঁরই দিকে চেয়ে আছে। স্টার্ট সাউন্ড! পটলবাবু গলাটা খাঁকরিয়ে নিলেন। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ–পাঁচ পা আন্দাজ হাঁটলে পর পটলবাবু ধাক্কার জায়গায় পৌঁছবেন। আর চঞ্চলকুমারের হাঁটতে হবে বোধহয় চার পা। সুতরাং দুজনে যদি একসঙ্গে রওনা হন, তা হলে পটলবাবুকে একটু বেশি জোরে হাঁটতে হবে তা না হলে রানিং। পটলবাবু খবরের কাগজটা তুলে মুখের সামনে ধরলেন। দশ আনা বিরক্তির সঙ্গে ছআনা বিস্ময় মিশিয়ে আঃ-টা বললে পরেই– অ্যাকশন! জয় গুরু! খচ খচ খচ খচ–খন্‌ন্‌ন্‌ন্‌। পটলবাবুহঠাৎ চোখে অন্ধকার দেখলেন। নায়কের মাথার সঙ্গে তাঁর কপালের ঠোকাঠুকি লেগেছে। একটা তীব্র যন্ত্রণা তাঁকে এক মুহূর্তের জন্য জ্ঞানশূন্য করে দিয়েছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে আশ্চর্যভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে পটলবাবু দশ আনা বিরক্তির সঙ্গে তিন আনা বিস্ময় ও তিন আনা যন্ত্রণা মিশিয়ে আঃশব্দটা উচ্চারণ করে কাগজটা সামলে নিয়ে আবার চলতে আরম্ভ করলেন। কাট। ঠিক হল কি? পটলবাবু গম্ভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে বরেনবাবুর দিকে এগিয়ে এলেন। বেড়ে হয়েছে! আপনি তো ভাল অভিনেতা মশাই…সুরেন, কালো কাচটা একবার চোখে লাগিয়ে দেখো তো মেঘের কী অবস্থা। শশাঙ্ক এসে বলল, দাদুর চোট লাগেনি তো? চঞ্চলকুমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে এসে বললেন, ধন্যি মশাই আপনার টাইমিং! বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছিলেন প্রায়–ওঃ। নরেশ ভিড় ঠেলে এসে বলল, আপনি এই ছায়াটায় দাঁড়ান একটু। আরেকটা শট নিয়েই আপনার ব্যাপারটা করে দিচ্ছি। পটলবাবু ভিড় ঠেলে ঘাম মুছতে মুছতে আবার পানের দোকানের ছায়াটায় এসে দাঁড়ালেন। মেঘে সূর্য ঢেকে গরমটা একটু কমেছে; কিন্তু পটলবাবু তাও কোটটা খুলে ফেললেন। আঃ, কী আরাম! একটা গভীর আনন্দ ও আত্মতৃপ্তির ভাব ধীরে ধীরে তাঁর মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তাঁর আজকের কাজ সত্যিই ভাল হয়েছে। এতদিন অকেজো থেকেও তাঁর শিল্পীমন ভোঁতা হয়ে যায়নি। গগন পাকড়াশি আজ তাকে দেখলে সত্যিই খুশি হতেন। কিন্তু এরা কি সেটা বুঝতে পেরেছে? পরিচালক বরেন মল্লিক কি তা বুঝেছেন? এই সামান্য কাজ নিখুঁতভাবে করার জন্য তাঁর যে আগ্রহ আর পরিশ্রম, তার কদর কি এরা করতে পারে? সে ক্ষমতা কি এদের আছে? এরা বোধহয় লোক ডেকে এনে কাজ করিয়ে টাকা দিয়েই খালাস। টাকা!কত টাকা? পাঁচ, দশ, পঁচিশ? টাকার তাঁর অভাব ঠিকই কিন্তু আজকের এই যে আনন্দ, তার কাছে পাঁচটা টাকা আর কী?… . মিনিট দশেক পরে নরেশ পানের দোকানের কাছে পটলবাবুর খোঁজ করতে গিয়ে ভদ্রলোককে আর পেল না। সে কী, টাকা না নিয়েই চলে গেল নাকি লোকটা? আচ্ছা ভোলা মন তো! বরেন মল্লিক হাঁক দিলেন, রোদ বেরিয়েছে। সাইলেন্স! সাইলেন্স!..ওহে নরেশ, চলে এসো, ভিড় সামলাও! সন্দেশ, শ্রাবণ ১৩৭০
Previousনিধিরামের ইচ্ছাপূরণ-সত্যজিৎ রায়
Nextপিন্টুর দাদু- সত্যজিৎ রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *