সু-সন্তান
সু-সন্তান পারমিতা রাহা হালদার (বিজয়া) অফিস থেকে বাপি ফিরতেই অভি রোজের মতো ছুটে গিয়ে বাপিকে জড়িয়ে ধরতেই বাপি বললো 'আমরা কাল পিকনিক করতে যাবো, সবাই মিলে সারাদিন খুব মজা করবো কেমন।'-পিকনিকের খবরে আনন্দে অভির হৈ চৈ  শুরু । চিৎকার শুনে অভির মাম্মা চোখ রাঙিয়ে বললো পিকনিক যাওয়ার আগে  পড়াশোনা কমপ্লিট করতে হবে, না হলে পিকনিক […]
সু-সন্তান পারমিতা রাহা হালদার (বিজয়া) অফিস থেকে বাপি ফিরতেই অভি রোজের মতো ছুটে গিয়ে বাপিকে জড়িয়ে ধরতেই বাপি বললো 'আমরা কাল পিকনিক করতে যাবো, সবাই মিলে সারাদিন খুব মজা করবো কেমন।'-পিকনিকের খবরে আনন্দে অভির হৈ চৈ  শুরু । চিৎকার শুনে অভির মাম্মা চোখ রাঙিয়ে বললো পিকনিক যাওয়ার আগে  পড়াশোনা কমপ্লিট করতে হবে, না হলে পিকনিক ক্যানসেল । মাম্মার কথামতো অভি পড়তে বসলো। আট বছর বয়সের অভি ভীষণ বুদ্ধিমান, তবে একটু দুষ্টু । বাপির অফিস  কলিগদের সাথে পিকনিক। পিকনিকের জন্য মাম্মা অনেক কিছু রান্না করতে শুরু করলো।  অভি পড়তে পড়তেই নিজের খাতা থেকে আপন মনেই কাগজ ছিঁড়ে ঘরে ফেলছে। পলিথিনের প্যাকেটে খাবার প্যাক করতে করতে মাম্মা অভিকে বলল,'চারিদিকে কাগজ ছড়িয়ে কেউ রাখে নাকি,ডাস্টবিনে ফেলো , ঘর পরিষ্কার রাখতে শেখো।'অভি  ছড়ানো কাগজ গুলি কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলল। অভির বাপির ইচ্ছেতেই লঙ ড্রাইভের পরিকল্পনায় পিকনিকের পথে চলেছে তারা। গাড়ি ছুটছে হাই রোড ধরে আর পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া  খাবার শেষ হতেই মাম্মা জানলা দিয়ে প্যাকেট বাইরে ফেলছে দেখে অভি বলে উঠলো, ' ইস মা, এটা আমাদের শহর,ডাস্টবিন দেখে প্যাকেট ফেলো মাম্মা।' মাম্মা হেসে বলল,এটা তো রাস্তা ঘর নাকি! তাতে কি মাম্মা, রাস্তাটাও তো আর ডাস্টবিন না।নতুন প্রজন্মের সচেতনতা বোধে জোর বার্তা পেল মাম্মা। মাম্মা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাকি প্যাকেট গুলি জড়ো করে ডাস্টবিন দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলল । গাড়ি জোরেই ছুটছে, কিছু দূর যেতেই রেল গেট পড়েছে , বাপি গাড়ি দাঁড় করলো কিন্তু ইঞ্জিন অফ করলো না। সামনে গাড়ির প্রচুর লাইন, ইঞ্জিন অন রেখে পেট্রল ওয়েস্ট  দেখে অভি বলল 'আরে কি করছো বাপি?' 'কেন রে কি করলাম?' অভি বললো,' ট্রেন তো আসছে না, গেট খুললে আগে সামনের গাড়ি যাবে তারপর আমাদের গাড়ি।' 'হ্যাঁ তাতে অসুবিধা কি হচ্ছে, বেশি কথা না বলে চুপ করে বসো অভি একটু পরেই গেট খুললেই আমরা এগাবো' 'প্লিজ বাপি, তুমি  ইঞ্জিন অফ করো,শুধু শুধুই পেট্রল ওয়েস্ট হচ্ছে,তাছাড়া পলিউশনও ছড়াচ্ছে। তুমি যদি ইঞ্জিন অফ করে দাও তাহলে এইগুলো কিছুটা হলেও বাঁচবে। আট বছরের ছেলের বুদ্ধিমত্তা, সচেতনতা দেখে সবাই অবাক হলো । ছেলের মাথায় বিলি কেটে একটু হেসে ইঞ্জিন অফ করলো। পিকনিকের স্থানে পৌঁছালো অভিরা। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। বাচ্চাদের জন্য নাগরদোলা ,খেলার গাড়িও রয়েছে।চারপাশে নানা রঙের  সুন্দর সুন্দর গাছগাছালি।  খেলাধূলা,গানবাজনায় মাতলো সবাই। সবাই বাড়ি থেকে ভালো মন্দ রান্না করে এনেছে।  থার্মোকলের প্লেটে পরিবেশন করা হচ্ছে খাবার। শেষ পাতে ফল । সবাই খাচ্ছে আর খাওয়া শেষ হতেই এঁটো প্লেটগুলো এদিকে সেদিকে ছুঁড়ে ফেলছে। মুহূর্তেই পরিষ্কার জায়গা  অপরিষ্কার হয়ে গেল দেখে অভি একটা বড়ো প্লাস্টিকের মধ্যে এঁটো প্লেট গুলি কুড়িয়ে রাখতে শুরু করে দিল। অভিকে এই কাজ করতে দেখে উপস্থিত অনেকেই বললো,'ছি অভি তুমি নোংরা ঘাঁটছো কেন? অভি বললো আমি নোংরা ঘাটছি না আমি নোংরা পরিষ্কার করছি।' সবাই কথাটা শুনে হকচকিয়ে উঠলো, অভি বললো,'আমরা এতক্ষণ যে পরিষ্কার জায়গায় আনন্দ করলাম সেই জায়গাটা আমরাই নোংরা করলাম। মাম্মা বলে ঘর পরিষ্কার করে রাখতে, যেখানে আমরা থাকি সেখানটা পরিষ্কার রাখা উচিৎ। এইটাও তো একটা পরিষ্কার জায়গা তাহলে এখনে সবাই মিলে নোংরা করছো কেন?' অভির কথা শুনে সবাই নিজেদের বিবেকের কাছে লজ্জিত হলো। বাপি বললো তুই কি সুন্দর করে এই বয়সেই ভাবতে পারিস, এইভাবে সবাই যদি ভাবতে পারতাম তাহলে আমাদের পরিবেশটা আজ অন্য রকম হতো । একজন অভির পলিথিনে ভরা এঁটো প্লেট ডাস্টবিনে ফেলে আসলেন। অন্য একজন ফলের বীজ গুলো মাটিতে সুন্দর করে ছড়িয়ে দিলেন। তার থেকে আবার নতুন গাছ হবে। কিছুদিন পরে অভির দিম্মা এলো অভিদের বাড়িতে। দিম্মা আর অভির মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক। এই সম্পর্ক মজবুত হয়েছে দিম্মার বলা নতুন নতুন গল্পে। অভিকে রাতে গল্প বলেই ঘুম পাড়ায় দিম্মা, আজ রাতেও তার অন্যথা হলো না। দিম্মা অভি কে একটা সুন্দর গল্প বলতে শুরু করলো, "এক দেশে একটা নির্জন এলাকায় একজন শিক্ষকের একটা স্কুল ছিল, সেখানে দূর দূর থেকে ছাত্ররা পড়তে আসতো। একবার ছাত্ররা পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফেরার আগে শিক্ষক মহাশয় কে কিছু গুরুদক্ষিণা  দিতে চাইল । শুনে শিক্ষক বললেন বেশ, তাহলে কাল ভোরবেলায় খালি পায়ে স্কুল থেকে দুই কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে অন্য পথে ফিরতে হবে। যে প্রথমে ফিরতে পারবে তাকে আমি পুরস্কার দেবো। তোমাদের সঠিক পথে ফেরাই আমার গুরুদক্ষিণা হবে। শিক্ষকের ইচ্ছামতো সব ছাত্ররা পরের দিন ভোরবেলায় একজোট হয়ে দৌঁড়াতে শুরু করলো। প্রথম হওয়ার জন্য নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী যে যার মতো দৌঁড়াচ্ছে, কেউ কেউ অনেকটা এগিয়ে গেছে আবার কেউ কেউ পিছিয়ে পড়েছে। এমন সময় একটা অন্ধকার গুহা এলো, সব ছাত্ররা এক এক করে গুহার ভিতর দিয়ে ছুটতে লাগলো কিন্তু কিছু দূর যেতেই ছাত্ররা বুঝতে পারলো পথে কাঁচের টুকরো পড়ে আছে। পা কেটে রক্ত পড়ছে।  কিছু ছাত্র পাছে পিছিয়ে পড়বে ভেবে দৌঁড়াতে শুরু করলো। কিন্তু কিছু ছাত্র ভাবলো আমাদের পিছনের বন্ধুদেরও পা কেটে যাবে কাঁচের টুকরো তে। যাতে তাদের বিপদ না হয় তাই ছাত্ররা বেশ কিছু কাঁচের টুকরো কুড়িয়ে নিজেদের পকেটে রাখলো। সব ছাত্ররা স্কুলে পৌঁছানোর পর শিক্ষক মহাশয় জিজ্ঞাসা করলেন পথে তাদের কোন অসুবিধা হয়েছে কিনা। সব ছাত্ররা  জানালো  তাদের কোন সমস্যাই হয়নি। শিক্ষক শুনে বললেন সেকি ! পথে অন্ধকার গুহার ভিতর দিয়ে আসার সময়েও কোন অসুবিধা হয়নি তোমাদের? প্রশ্ন শুনে অনেক ছাত্ররা বললো, হ্যাঁ ওখানে কাঁচের টুকরো থাকায় পা কেটে গেছে। আচ্ছা বেশ, এবার বলো তোমাদের মধ্যে কে প্রথমে স্কুলে পৌঁছেছো। --কিছু ছাত্র বলল আমরা শিক্ষক মহাশয়। শিক্ষক এবার বাকিদের ফিরতে দেরি হওয়ায় কারণ জানতে চাইলেন, বাকি কিছু ছাত্র এবার গুহার ভিতরে কাঁচ কুঁড়ানোর গল্প বললো, শিক্ষক শুনে বললেন কাঁচ গুলো বার করো। ছাত্ররা পকেট থেকে কাঁচ বার করতেই শিক্ষক বললেন ভালো করে দেখো এগুলো হীরে,কাঁচ নয়। হীরে দেখে বাকিদের চক্ষুও স্থির হয়ে গেল। প্রথম যে ছাত্ররা স্কুলে পৌঁছেছিল তারা এবার পুরস্কার চাইল শিক্ষকের কাছে।  শিক্ষক বললেন আমি আমার পুরস্কার যারা সত্যি প্রথম হয়েছে তাদের দিয়ে দিয়েছি। শুনে এবার ছাত্ররা অবাক হলো। শিক্ষক বললেন, যারা অন্যদের ভালোর জন্য নিজেদের পরাজিত করতে কুন্ঠা বোধ করেনা প্রকৃত অর্থে তারাই আসল বিজয়ী। ওই হীরে গুলো তাদের পুরস্কার।" দিম্মার গল্প শুনে অভি ঘুমিয়ে পড়লো। গল্প থেকে সুন্দর শিক্ষা অর্জন করলো। এরপর অভির পরীক্ষা শুরু হলে বাপির গাড়ি করে স্কুলে পৌঁছালো। গাড়ি থেকে নামতেই বন্ধুরা অভিকে ভাকলো, অভি বন্ধুদের দিকেই এগোতেই দেখলো এক অন্ধ বৃদ্ধা রাস্তা পার হচ্ছে আর সামনে  একটা গাড়ি ধেয়ে আসছে।অভি বৃদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে গেল, বন্ধুরা বললো,'যাস না পরীক্ষার ঘন্টা পরে গেছে স্যরেরা বকবে।' অভি গুরুত্ব না দিয়ে ছুটে বৃদ্ধার হাত ধরে রাস্তা পার করে প্রাণ বাঁচালো। বন্ধুরা পরীক্ষা দিতে শুরু করেছে। অভির দেরি দেখে স্যার অভিকে বকে দেরির কারণ জানতে চাইলেন।অভি সব ঘটনা খুলে বলতে স্যর সহ পুরো স্কুল গর্বিত হলো।  স্কুলের এক অনুষ্ঠানে অভিকে সম্মানিতও করা হলো ।
Previousখড়কুটোর গুচ্ছ কবিতা-কলমে বিকাশ দাস ( মুম্বাই)
Nextদেশের ম্যাপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *