স্রোত
স্রোত অরুন্ধতী আমি বললাম , 'যেতে হবে না । এই অবেলায় খুব কষ্ট হবে তোর ।' সূর্যটা এইসময় বড়ো বেশি অসহ্য লাগে । আমি চাইছিলাম না যে এই রৌদ্রের মধ্যে সুমন বাইরে যাক । তাছাড়া অফিস ছুটির দিনটাতে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল আমার কলিগ ওরফে বেস্ট ফ্রেন্ড সুমনের সাথে । বললাম , 'ওকে এখানে […]
স্রোত অরুন্ধতী আমি বললাম , 'যেতে হবে না । এই অবেলায় খুব কষ্ট হবে তোর ।' সূর্যটা এইসময় বড়ো বেশি অসহ্য লাগে । আমি চাইছিলাম না যে এই রৌদ্রের মধ্যে সুমন বাইরে যাক । তাছাড়া অফিস ছুটির দিনটাতে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল আমার কলিগ ওরফে বেস্ট ফ্রেন্ড সুমনের সাথে । বললাম , 'ওকে এখানে ডেকে নে না ।' 'না । আজ একটা প্ল্যান আছে । সায়রবীথি যাবো ।' 'সে তো এখন খোলা থাকবে না । এই দুপুরে পার্কের প্রহরীও নাকে তেল দিয়ে ঘুমোবে ।' 'তার আগে ওর জন্য গিফ্ট কিনতে হবে ।' 'পরশুদিনই তো দিলি না ?' 'ওর জন্মদিন ছিল ।' 'আর আজ ?' 'আজ ওকে আমার একটা সিদ্ধান্তের কথা বলবো ।' 'যাতে না বলতে না পারে সেজন্য গিফ্ট দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিবি , তাই তো ?' 'তোর সবকিছু বাঁকা চোখে দেখা একটা স্বভাব হয়ে গেছে ।' সুমন রেগে বেরিয়ে গেল । আমি বিছানায় বসে কিছুক্ষণ খবরের কাগজটা নাড়াচাড়া করছিলাম । হঠাৎ চেনা ডাক শুনে বাইরে গেলাম । অনুরাধা এসেছে । 'তুমি এসময় এখানে ?' 'কেন , আসতে নেই ?' 'না , মানে , সুমন তো এখন নেই , তাই ।' ও বলল , 'জানি ।' অবাক হলাম । সুমন নেই জেনেও এসেছে ? 'আমার কাছে !' 'হ্যাঁ । আসলে ভালো লাগছিল না । তাই ভাবলাম ...' ভালো আর লাগবে কীভাবে ! ভালবাসার জন যদি ভালবাসা না বোঝে ! বললাম , 'বসো ।' তারপর নির্বোধের মতো একটা বোকা প্রশ্ন করে ফেললাম । 'তুমি সুমনকে খুব ভালবাসো , তাই না ?' প্রশ্নটা করেই বুঝতে পারলাম , অনুরাধাকে এতটা নগ্ন করা উচিৎ হয়নি । ও আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে । ওর এক অতি গোপন তথ্য আমি যেন কীভাবে জেনে ফেলেছি ! প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম , 'শুধু স্কুল নিয়েই আছো , নাকি এমএ টা কমপ্লিট করার প্ল্যান আছে ? পরীক্ষা তো সামনেই । প্রস্তুতি কেমন ?' সম্বিত ফিরে পেল সে । বলল , 'স্কুল তো বাধ্যতামূলক । কিন্তু পড়াশোনার আর সময় পাচ্ছি না । পরীক্ষায় কী যে লিখব !' তারপর নানা কথায় কথা বেড়ে যায় । ওর সাথে কথা মানেই জয় গোস্বামী আর শুভ দাশগুপ্ত । এঁদের কবিতা খুব ভালবাসে অনু । আমিও । জয় গোস্বামীর 'সেলাই দিদিমণি'র সাথে অনুর একটা মিল আছে কোথাও যেন । যার জন্য আমি বাধ্য হই অনুর কথা ভাবতে । গোপনে খুব কষ্ট পাই অনুর জন্য । আমাদের কথার মাঝেই ঘরে এলো সুমন । 'আরে , তুমি কতক্ষণ ?' 'আমি তো ...' ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হতবাক অনু । আমরাও । সাড়ে আটটা বেজে গেছে । সর্বনাশ ! কখন যে এতটা সময় বয়ে গেছে কেউই খেয়াল করিনি আমরা । আসলে , কবিতা যদি টপিক হয় , তবে এমনটা হয়েই থাকে আমাদের । সুমনের কাছে এসব একেবারেই বোগাস ! তাই আমি চাইলেও সুমনের অপছন্দ বলেই আলোচনায় যবনিকা টানে অনুরাধা । আজ সুমন ছিল না বলেই সময়টা ধরা পড়েনি । তিনজনেই বেরিয়ে পড়লাম । অনুকে মেসে পৌঁছে দিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এতক্ষণ চেপে রাখা প্রশ্নটা করেই ফেললাম , 'এত খুশি লাগছে তোকে ? প্রিয়াঙ্কার সাথে কী প্ল্যান করলি, বললি না তো !' 'রুমে চল , বলছি ।' দুপুরে খাওয়ার পর আর কিছু খাওয়া হয়নি । পেটব্যথা শুরু হয়েছে । তাই মোড়ের দোকান থেকে রুটি তরকারি নিয়ে তাড়াতাড়ি হেঁটে ফিরলাম দুজনে । খাওয়াদাওয়ার পর শোয়ার ব্যবস্থা করে দুজনে বসলাম বিছানায় । সুমন যা বলল , তা এইরকম -- প্রিয়াঙ্কার বাবা ওর অন্যত্র বিয়ে ঠিক করেছে । সুমনের চেয়ে অনেক ভালো রোজগার করে । তাই বাধ্য হয়েই ওরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করছে । আর সেটা খুব শিগগির । বললাম , 'ভেবে নিচ্ছিস তো ডিসিশানটা ?' 'ভাবাভাবির তো কিছু নেই । এটাই তো হওয়ার ছিল !' 'অনুরাধার কথাটা ভাববি না একবার !' 'মানে ?' 'ও কিন্তু তোকে ভালবাসে ।' বিকট একটা হাসি হেসে সুমন বলল , 'কবিতা ছাড়া ও আর কিছু ভালবাসে ?' 'এটা তোর ভুল ধারণা ।' 'না না , তোর ভুল হচ্ছে । তুই এসব ভাবিস না তো । গল্প লিখে লিখে তোর মাথাটা গেছে । যত রাজ্যের ফালতু কথা মাথায় ঘুরপাক খায় ।' সুমনের এই কথার পর আর কথা বলা সম্ভব হয় না আমার পক্ষে । আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ি দুজনেই । বলব বলব করেও অনুকে বলতে পারি না সুমনের সিদ্ধান্তের কথা । ওর অসহায়তার কথা ভেবেই ওকে ভালবাসতে ইচ্ছে হয় । অনুর মুখটা সব কাজের মধ্যে মনে পড়ে যায় বারবার । আর বুকের ভেতর অন্যরকম যন্ত্রণা অনুভব করি । সেদিন আমি , অনু , প্রিয়াঙ্কা আর সুমন একসাথে পার্কে গেলাম । অনু যেতে চায়নি । ওকে প্রায় জোর করেই নিয়ে যাওয়া হল । সেখানেই সুমন ফাইনাল ডিসিশানটা আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করল । আমি অনুর দিকে দেখতেই কেমন মনে হল , ওর চেহারার জ্যোতি যেন মুহূর্তের জন্য উবে গেল । তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে একটু বেশিই আনন্দ প্রকাশ করল যেন । অনুর এমন করুণ অবস্থা আমাকে ব্যথিত করে । মনে হয় , আমার বুকে ওকে টেনে নিয়ে বলি , অনু , আমি তো আছি । কিন্তু আমি জানি , অনু সুমনকে ভালবাসে । মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় সুমনের উপর । কেমন যেন মনে হয় , ও অনুর উপর অবিচার করছে । অনুকে আমার খুব ভালো লাগে বলেই কিনা জানিনা , প্রিয়াঙ্কা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে ইদানিং । খুব আনন্দে আজ সুমন সবাইকে খাওয়ালো । সুমন আর প্রিয়াঙ্কার খাওয়া স্বাভাবিকই ছিল । অনু অনেকটা কম , শুধু ওদের বুঝতে না দিতে একটা প্রচেষ্টা । অনুর এই অসহায়তা আমার খাওয়ার ইচ্ছেটাকে দমিয়ে দেয় । আমি খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে অনুকে লক্ষ করতে থাকি । অনুর অপটু অভিনয় আমাকে ফাঁকি দিতে পারে না । সুমন বলে , 'খাচ্ছিস না যে ?' বললাম , 'শরীরটা ঠিক লাগছে না । খিদে নেই ।' অনুরাধা আর প্রিয়াঙ্কাকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলাম আমরা । ইচ্ছে করেই সাত তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম । সুমনের উপর খুব রাগ হচ্ছে । অনুরাধা আজ দুচোখের পাতা এক করতে পারবে না । হয়তো ও খুব কাঁদবে । অনুরাধা , আমি তোমাকে ভালবাসতে চাই । অনুরাধা , তোমাকে খুব -- খুব -- খু-ব ভালবাসি আমি । অবশেষে সেই দিন এলো । আমি জানতাম , অনুও আসবে । সুমনকে ভালবাসে বলেই আসবে । কিন্তু আমার যেতে ইচ্ছে করছিল না । কেমন যেন মনে হচ্ছিল , অনুরাধার ভালবাসার পূর্ণতাপ্রাপ্তিতে আমিও কোন না কোনভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াব । আমি কেমন মুষড়ে পড়ছিলাম । হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছিল । আমি রুমে একা ছিলাম । সুমন গেছে সিঁদুর আর মালা কিনতে । ও কেনাকাটা করে চৌমাথা মোড়ে দাঁড়াবে । ওখান থেকে আমরা একসঙ্গে যাবো । অনুকে নিয়ে যাবার ভার পড়েছে আমার উপর । আমার সাতপাঁচ ভাবনার মধ্যেই অনু এলো । ও একটা হলুদ সিল্কের শাড়ি পরেছে । কপালে লাল টিপ আর হালকা লিপস্টিকে অসাধারণ লাগছে ওকে । আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি । ও বলে , 'কেমন দেখাচ্ছে আমায় ?' আমি উত্তর দিতে পারি না । শুধু মনে হয় , সমস্ত যন্ত্রণাকে পাথরচাপা দিয়ে অনু হাসছে । হায় নারী , তোমায় বুঝতে নারি ! অনু আবার বলল , 'ভালো লাগছে না ?' খুব সুন্দর । অপূর্ব । আমি হারিয়ে যাচ্ছি অনু । ইচ্ছে করছে এখানে এভাবেই বসে তোমায় দেখতে থাকি ... নিজের মনেই বলে যাচ্ছিলাম কথাগুলো । অনু কী ভাবলো কে জানে ! বলল , 'চলো । দেরি হয়ে যাচ্ছে ।' আমরা চৌমাথায় যেতেই তেড়ে এলো সুমন । 'এত দেরি ! কী করছিলি এতক্ষণ ?' অনু বলল , 'বাব্বা ! প্রিয়াঙ্কা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার হয়ে যাবে । এত তাড়া কিসের ? অনেক সময় আছে ।' 'প্রিয়াঙ্কা তো আমারই ।' 'না না , আমি ঠিক তা বলিনি ।' কেমন অপ্রতিভ হয়ে পড়ে অনু । সুমন হেসে বলে , 'আমিও বলিনি । চলো যাই । ও ওয়েট করবে ।' আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেছি সময়ের অনেক আগেই । প্রিয়াঙ্কা তখনও আসেনি । কেমন পাগলপনা শুরু করেছে সুমন । কেন দেরি হচ্ছে জানতে মোবাইলে বারবার ডায়াল করছে প্রিয়াঙ্কার নম্বর । প্রিয়াঙ্কার মোবাইল বন্ধ ! সুমন খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে । অনু ওকে সান্ত্বনা দেয় । আমি একটা সেগুন গাছের নীচে বসে দেখতে থাকি সব । অনু বলে , 'আচ্ছা , তোমরা কোথায় থাকবে ঠিক করেছো ?' 'হ্যাঁ , একটা ঘর দেখেছি । প্রিয়াঙ্কারও পছন্দ ।' 'বাঃ , খুব ভালো ।' একটু অন্যমনস্কভাবে অনু বলে , 'দুটো রুম আর একটা কিচেন । ঘরের সামনে একটা সবুজ মাঠ । তারকাঁটার বেড়া দিয়ে ঘেরা । বেড়ার ধারে ধারে নানা ফুলের ...' সুমন বলে উঠল , 'তুমি কীভাবে জানলে !' সুমনের প্রশ্নে সচেতন হয় অনুরাধা । বিজ্ঞের মতো বলে , 'সবই আমার নখদর্পণে ।' সুমন বলে , 'তুমি না জেনেই কেমন বললে । প্রিয়াঙ্কার কোন প্ল্যান নেই । ওর এসবে অনুরাগই নেই , জানো !' 'কোই বাত নেহি । দোস্ত দোস্তকে লিয়ে । হাম হ্যায় না ! (একটু থেমে) আচ্ছা , আমি তোমার মেহবুবাকে মানুষ করে দেব ।' দোস্ত ! এরপর দাদা বনে যাবে ! আমি অনুর অভিনয় আর সহ্য করতে পারি না । জীবনে যে দুঃখ আছে সেকথা স্বীকারই করে না । সুমন বলে , 'আচ্ছা , ঘরটা কীভাবে সাজানো যায় বল তো ?' 'ঘরটা ? হ্যাঁ , সে এক ভাবার বিষয় । তুমি কীভাবে সাজাতে চাও ?' 'এই ধরো , ঘরে ঢুকতেই একটা পাখি আগন্তুককে ওয়েলকাম করবে !' অনু লাফিয়ে ওঠে , 'টিয়া !' 'হ্যাঁ , মন্দ হয় না ।' বলে , 'ড্রয়িংরুমে একটা অ্যাকোয়ারিয়াম থাকবে ...' কথা কেড়ে নিয়ে অনু বলে , 'নানা রঙের মাছ খেলা করবে -- লাল, নীল , হলুদ -- ' 'একদম । ' আমি আশ্চর্য হয়ে দেখি কেমন অবলীলায় সুমন আর প্রিয়াঙ্কার সংসার সাজিয়ে দিচ্ছে অনু ! অনু আবার শুরু করে , 'আর ঘরে ঢুকেই ঠিক ডানদিকে একটা বড়ো ফুলদানীতে বাগানের ফুল ...' অনুকে থামিয়ে দিয়ে সুমন হঠাৎ বলে বসল , 'অনুরাধা , প্রিয়াঙ্কা তোমার মতো হল না কেন ?' অনুর চেহারার জ্যোতি দপ করে নিভে গেল সুমনের অলক্ষ্যেই । মনে মনে বললাম , ন্যাকা ! এতদিন বুঝেও বুঝল না । আর আজ ঢং করছে । ইচ্ছে করছিল , সুমনের গালে ঠাস করে একটা চড় মারি । এরপর সুমন হঠাৎ বলে বসল , 'তুমি যেভাবে বলে যাচ্ছো , মনে হচ্ছে তুমি নিজের ঘর সাজাবে !' অনুর মুখ পানসে হয়ে যায় । আমি দেখি , সুমন অদ্ভুতভাবে হেসে ওঠে কথাটা বলার সাথে সাথে । অনু , কী অসহায় চেহারা তোমার তখন , তুমি যদি দেখতে ! আমার অসহ্য লাগে । মুখ ফিরিয়ে চুপ করে বসে থাকি । সুমন তখনও হাসছে । এসময় সুমনের সেলফোন বেজে ওঠে । 'হ্যাঁ , বলো ' .....' কী ? কী বললে ?' .....' প্রিয়া ?' ....' তুমি একবার আমার কথা শোনো' ...... লাইন কেটে গেছে । সুমনের করুণ মুখ দেখে আমি উঠে দাঁড়াই । অনু প্রথম কথা বলে , 'কী বলল , প্রিয়াঙ্কা ?' সুমন মাথা নাড়ে । 'আসবে না ।' 'সে কি ! কেন ?' 'ওর বাবার পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করবে ও ।' শিশুর মতো কেঁদে ফেলে সুমন । অনু ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেলে । সুমনের জন্য কষ্ট হয় আমারও । অনু দুহাতে ছুঁয়ে ছিল সুমনের পিঠ আর ডানহাত । সুমন দুটো হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্না লুকোতে চাইছিলো হয়তো । আমি ওকে কোন সান্ত্বনা দিতে পারি না । একসময় অনুর হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় সুমন । চোখ মুছে নেয় । তারপর বায়ুবেগে কোথায় চলে যায় । অনু ভাঙা গলায় কয়েকবার ডাক দেয় , 'সুমন ..সুমন ..' সুমন পিছনে তাকায় না । শুধু সুমনের চলে যাওয়ার পথের দিকে অপলক চেয়ে থাকে অনুরাধা । আর আমি একবুক ভালবাসা নিয়ে চেয়ে থাকি কূলভাঙা অনুরাধার পানে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *