জাতিভেদ
ওরা কী সুন্দর, ওরা কেমন ভাইয়ের সঙ্গে খেলা করে, ফোটা দেয়, খুনসুটিও করে, আর ওদের ভাইগুলোও ওদের দিদিদের কতো ভালোবাসে। রাখী পূর্ণিমার দিন বোনেরা ওদের দাদাদের হাতে রাখী পরিয়ে দেয়, ওদের দাদারাও বোনকে খুব ভালোবাসে। ইস, আমার যদি ওদের মতো একটা ভাই থাকতো, রিতা ভাবে,শুধু বসে বসে এইসব কথাই ভাবে। ও ভেবে পায়না, ভগবান কেন […]
ওরা কী সুন্দর, ওরা কেমন ভাইয়ের সঙ্গে খেলা করে, ফোটা দেয়, খুনসুটিও করে, আর ওদের ভাইগুলোও ওদের দিদিদের কতো ভালোবাসে। রাখী পূর্ণিমার দিন বোনেরা ওদের দাদাদের হাতে রাখী পরিয়ে দেয়, ওদের দাদারাও বোনকে খুব ভালোবাসে। ইস, আমার যদি ওদের মতো একটা ভাই থাকতো, রিতা ভাবে,শুধু বসে বসে এইসব কথাই ভাবে। ও ভেবে পায়না, ভগবান কেন এতো নিষ্ঠুর! কতজনকে কত কী দেয়, কিন্তু ওকে কেন একটা ভাই দিতে পারে না! রিতা পাশের বাড়ির ছোট ছোট ভাই -বোনদের দেখছিল আর মনে মনে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। কাল তো ভাইফোটা, ওরা কেমন ভাইকে ফোটা দেবে, মিষ্টি খাওয়াবে। কিন্তু ও? ও কী করবে? হঠাৎ ওর মনে হলো সবির আলীর কথা। ও তো এখানে প্রায়ই আসে, বাবার সঙ্গে কী যেন সব দরকারি কাজকর্ম করে। ওকে খুব ছোট বয়স থেকেই কাজ করতে হয়। রিতা ঠিক করলো, ওকেই ফোটা দেবে। খাওয়ার পর ও ওর বাবাকে বললো, "বাবা, তুমি কাল সবিরকে ডেকে একবার আসতে বলো না। " ও জানে, ওর বাবা যদি জানতে পারে, ওকে ফোটা দেবে, তাহলে তার আর ফোটা দেওয়া হবে না। শুনে ওর বাবা ভ্রু কুচকে বললেন, " কেন রে, ওকে আবার কাল তোর কী দরকার?" _"আমি ওর কাছে ওদের দেশের মজার মজার গল্প শুনবো।" সত্যিই সবির কতো সুন্দর সুন্দর গল্প বলে নিজেদের দেশ সম্পর্কে, রিতাদের তো আর দেশ নেই, তাই সে হা করে শুনে ওইসব গল্পগুলো। __"বেশ তো, দুদিন পরে যখন আসবে, তখন না হয় গল্প করিস।" রিতা জানে, ওর বাবার কোন না কে হ্যাঁ করানো যায় না, এরপর কোন কথা বললে হয়তো বাড়িতে ভয়ানক হুলস্থুল পরে যাবে। নাহ, রিতা একাই রয়ে যাবে, ও আর কাউকে কোনদিন ফোটা দিতে পারবে না। কিন্তু ভাগ্যক্রমে, সেদিনই হঠাৎ সবির তাদের বাড়িতে এলো, কী একটা দরকারে। এমনি রিতাও ওকে কাল আসার কথা বললো। পরদিন ভোর থেকে উঠেই ওর কাজ শুরু হয়ে গেছে। সত্যিই তো, প্রদীপ জ্বালা, চন্দন ঘষা, মিষ্টি সাজানো, কম কাজ নাকি! ___কইরে মা, খাবি আয়, ওর মা হাক দেন রান্নাঘর থেকে। ___দাঁড়াও মা, এখনো তো সবিরদা আসেনি, ও আসুক, ও এলে ওকে ফোটা দিয়ে তবেই খাবো। রিতা থালা গোছাতে গোছাতে উত্তর দিলো। ওর মা ভাবলেন মেয়ের মাথা বুঝি একদম খারাপ হয়ে গেছে, নয়তো ও এমন কথা বলবে কেন! ও কী জানে না, যে কতো বড় সম্মান, প্রতিপত্তি ওদের, ওরা নাকি এককালে জমিদার ছিলো, পরে অবস্থাক্রমে একটু টান পরেছে সংসারে। কিন্তু রিতার ছোট অবুঝ মন কিছুই বুঝতে চায় না, সে জানে না জাত কী, জাত কেন যায়, তাই বলে বসে, __না মা, আমি ওকে ফোটা দেবই। ___কিন্তু ওরা যে নিচু জাত। ওরকম নিচু জাতে ফোটা দিলে জাত খোয়াতে হবে যে। __কিন্তু মা, আমার যখন টাইফয়েড হয়ে ছিলো, তখন তো ওরাই, ওই নিচু জাতই আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে জীবন বাচিয়েছিল। সেদিন যদি ওরা ওভাবে উপকার ননা করতো, তবে আমি মরেই যেতাম মা। সরলা দেবী ওইটুকু মেয়ের ওই একটা যুক্তির কাছে হার মানলেন, ভেবে পান না, এর উত্তরে তিনি কী বলবেন! হঠাৎ ওর বাবার গম্ভীর কন্ঠ শোনা যায়, ও তো ঠিকই বলেছে সরলা। সেদিন যদি ওদের উপকার ননা পেতাম, তাহলে কী আমরা ওকে সারিয়ে তুলতে পারতাম? শুধু মিথ্যা অহংকার আর জাত অভিমানের বশে এতোদিন আমি সত্য থেকে দূরে সরে থেকেছি। আজ আমার মা এসে সেই ভুল ভাঙ্গিয়ে দিলো। তুমি তারাতারি ব্যবস্থা করো, আর ফোটা দেয়ার সময় শঙ্খ বাজিও, এতে আমাদের পূর্বপুরুষের অপমান হবে না, বরং তারা খুশিই হবেন। দেখ, ভালো কাজে জাক কখনো যায়না, কখনো না। রিতা খুব খুশি হলো ওর বাবার কথায়, বললো__বাবা, তুমি কত ভালো। তারপর সবির আলী এলে সরলা দেবী শঙ্খ তুলে নিলেন। রিতা ফোটা দিলো, বহুদিন পর উচ্চবর্ণের নিয়ম ভেঙ্গে দিলো ওইটুকু একটা মেয়ে আর সবিরের কোন আপত্তি টিকলো না। উচ্চবর্ণের বাড়ির আসনে বসে ওদেরই দেওয়া মিষ্টি খেলো সবির। আর অদূরে দাড়িয়ে চোখের জল মুছলেন রিতার বাবা। এবার থেকে শুধু ভাইফোটাই নয়, রাখীপূর্ণিমায়ও ওকে রাখী পরিয়ে দিতো রিতা। আর ঈদে, মহরমে ওদের বাড়িতে লাড্ডু আর লাচ্ছা দিতে আসতো সবির। ___________________________________________ আমাদের সবাইকে এমনিভাবেই জাতিভেদ ভুলে সবাইকে তালে তাল মিলিয়ে একসাথে চলতে হবে। সম্প্রীতির মেল বন্ধনে পুরো পৃথিবীকে আলোকিত ও ভালবাসায় সিক্ত করতে হবে। তবেই কারনে অকারনে মানুষের মধ্যকার দন্দযুদ্ধ, প্রাণনাশ বন্ধ করা সম্ভব। গল্প: জাতিভেদ কলমে অন্তরা ঘোষ কর্মকার
Previousঅমূল্য উপহার
Nextমঙ্গল কষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *