প্রবন্ধ -সাওতাল বিদ্রোহ কলমে বানীব্রত
প্রবন্ধ  সাওতাল বিদ্রোহ কলমে বানীব্রত সময়টা ছিলো ১৮৫৫ সাল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায় শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল এর।   সাঁওতালরা ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে আন্দোলন। এটাই ছিল তাদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রাম। সাঁওতালদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানু, চাঁদ,ভৈরব প্রমুখ। ১৭৯৩ […]
প্রবন্ধ  সাওতাল বিদ্রোহ কলমে বানীব্রত সময়টা ছিলো ১৮৫৫ সাল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায় শুরু হয় সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল এর।   সাঁওতালরা ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে আন্দোলন। এটাই ছিল তাদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র গণসংগ্রাম। সাঁওতালদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানু, চাঁদ,ভৈরব প্রমুখ। ১৭৯৩ সাল, লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ি বন্দোবস্তের ফলে তাদের উপর বেড়ে গিয়েছিল অত্যাচার। তাই সিপাহী বিদ্রোহের আগে তাদের অধিকার আদায়ের জন্য, সাঁওতালরা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল ১৮৫৫ সালে। তারা  যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল ইংরেজদের শাসন-শোষণ, সুদখোর, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সৈন্য এবং  তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা।  একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করাও ছিলো তাদের উদ্দেশ্য ।সাঁওতালদের ইতিহাসের পাতা উল্টে  জানা যায় দামিন-ই কোহ ছিল সাঁওতালদের নিজস্ব গ্রাম, নিজস্ব দেশ। সাঁওতালদের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধ প্রায় সতের মাস চলেছিলো।  যা  শুরু হয়েছিল ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন  এবং পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে । এই সময় অর্থাৎ ১৮৫৫ খ্রি. ৩০শে জুন প্রায় ত্রিশ হাজার সাঁওতাল কৃষক বীরভূমের ভগনাডিহি থেকে সমতলভূমির উপর দিয়ে কলিকাতার অভিমুখে পদযাত্রা করেছিলো যাকে ভারতের ইতিহাসে প্রথম গণ পদযাত্রা বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিলো। সাওতাঁলরা এই যুদ্ধে তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্রসস্ত্রকে ব্যাবহার  করেছিল। বিপক্ষে  ইংরেজ বাহিনীর হাতে ছিলো বন্দুক ও কামান। তাছাড়াও  ঘোড়া আর হাতি এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিলো। এই বিদ্রোহকে নির্মুল করার জন্য কোম্পানীর বড় কর্তারা ৩৭শ, ৭ম, ৩১শ রেজিমেণ্ট, হিল রেঞ্জার্স, ৪৩, ৪২ ও ১৩ রেজিমেন্টকে ব্যবহার করেছিলো।এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধার প্রাণহানী ঘটেছিলো । জমিদার-মহাজন-সুদখোর ও নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সাঁওতাল কৃষকরা যে বিদ্রোহ শুরু করেছিলো সেই বিদ্রোহের সাথে যোগ দিয়েছিল- কুমার, তেলী, কর্মকার, চামার, ডোম, মোমিন সম্প্রদায়ের গরিব মুসলমান ও গরির হিন্দু জনসাধারণ। যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিলো ৭ই জুলাই দিঘি থানার মহেশলাল দারোগাসহ ১৯ জনকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। সাঁওতালবিদ্রোহে নারীরাও অংশগ্রহণ করেছিলো প্রত্যক্ষভাবে। অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসী নারীরা ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকেনি, তাদের হাতেও গর্জে উঠে ছিলো অস্ত্র । ২৩শে জুলাই ১৮৫৫ তে Hindu Intelligence পত্রিকাতে এক সাঁওতাল প্রধানের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে সাঁওতাল নারীদের উপর প্রচলিত নির্যাতনের যেমন প্রমাণ মেলে; তেমনই এটি যে বিদ্রোহের ও একটি কারণ ছিলো সেটিও বোঝা যায়। পুরুষের সহযোগী বা সশস্ত্র ভূমিকায় ছিলেন  নারীরা। ১২ জন সাঁওতাল পুরুষ ও ১০০ জন নারী মহারাজপুর নামক একটি গ্রামে প্রবেশ করে।  সেই গ্রামের প্রজারা সেই সময় যেমন প্রহৃত হয় সাঁওতাল পুরুষদের হাতে  তেমনই সেই সময় স্ত্রীলোকেরা চালায় দেদার লুটতরাজ। কৃষক সমাজের প্রথম গণসংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এই সাঁওতাল বিদ্রোহ।  কৃষক সম্প্রদায়ের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, বাঁচার অধিকারের দাবীতে ছিল  এই সংগ্রাম। শুধু তাই নয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে,  প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে, এই সাঁওতাল বিদ্রোহকে চিহ্নিত করা হয়েছিলো  । সাঁওতাল নেতাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন ইংরেজরা। সহকারী নায়কের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় নায়কদের জন্য এক হাজার টাকা পুরস্কার মুল্য ধার্য্য করা হয়েছিলো। সিধু-কানুর বোন ফুলমনির লাশ উদ্ধার করা হয় রেললাইনের ধার থেকে। শোনা যায়, ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের পর ব্রিটিশ সিপাইরা তাকে হত্যা করে সেখানেই ফেলে যায়। এই ফুলমনিকে নিয়ে আদিবাসী সাঁওতালদের গান রয়েছে। যানারোহী এক সান্তাল সরদার ঐ দলের সঙ্গে ছিল, গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়।  তার মৃত্যুর পরে প্রকাশ যে ঐ সরদার পুরুষ ছিলো না,  পুরুষ বেশে একজন রমনী ছিলেন ওই দলে। সিধু মুুরমু ছিলেন সাঁওতাল বিদ্রোহের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। কিছু লোকের বিশ্বাসঘাতকতায়  তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বিদ্রোহের আর এক কান্ডারী ছিলেন কানু মুরমু ।সাঁওতাল বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান নায়ক। প্রধানতম নায়ক সিধু মাঝির ভাই ছিলেন তিনি এবং এছাড়াও এই বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য নাম চাঁদ ও ভৈরব ।এরাও ছিলেন সিধু কানুর ভাই। বীরভূম জেলার ওপারে সশস্ত্র পুলিশবাহিনীর গুলিতে কানুর মৃত্যু হয়। ভৈরব ও চাঁদ ভাগলপুরের কাছে এক ভয়ংকর যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দেন। সাঁওতালদের গুরু ছিলেন কলেয়ান গুরু। সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসের লিপিকার এবং  তিনি তাঁর "হড়কোড়েন মারে হাপড়ামকো রেয়া কথা"শীর্ষক একটি রচনায় সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত লিখে রেখে গেছেন। এই ইতিবৃত্তে সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক সিধু ও কানুর সংগ্রাম-ধ্বনি,  "রাজা-মহারাজাদের খতম করো", "দিকুদের (বাঙালি মহাজনদের) গঙ্গা পার করে দাও", "আমাদের নিজেদের হাতে শাসন চাই" প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করা আছে। সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা ব্রিটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধে সিধু-কানু-চান্দ ও ভাইরব পর্যায়ক্রমে নিহত হয়েছিল। আর তারপরই পরই থেমে যায় এই ইতিহাসখ্যাত আন্দোলন। সিধুকানুরএই বিদ্রোহ ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বীজ বপন করে গিয়েছিল। সাঁওতাল জাতির ইতিহাসে সিধো-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ  ছিলো সর্বাধিক বৃহত্তম এবং গৌরব উজ্জ্বল যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলাফলে ইংরেজ সরকার সাঁওতালদের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করেছিল। ম্যাজিট্রেট এডন সাহেব সাঁওতালদের আবেদন শুনেছিলেন। যুদ্ধের পরে সাঁওতালদের সমস্যা বিচার বিবেচনা করে আদিবাসী সাঁওতালদের জন্য একটি জেলা  নির্ধারিত করা হয়েছিলো। সেই জেলার নাম ছিলো ডুমকা। এটাই সাঁওতাল পরগনা নামে পরিচিত হয়েছিল । এখানে সাঁওতাল মানঝি্, পরানিক, পরগনা জেলার শাসন পরিচালনার জন্য দারোগা, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি কমকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ করা হয়েছিলো। সাঁওতালদের বিচার সালিশ তাদের আইনে করার জন্য সরকার ক্ষমতা প্রদান করেছিলো। খাজনা, কর প্রভৃতি তাদের হাতেই দেওয়া হয়ে ছিলো। তারা জেলা প্রশাসক বা ডিসির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেনান্সি এ্যাক্ট অনুযায়ী আদিবাসীরা তাদের জমি সরকারী অনুমতি ছাড়া বিক্রি করতে পারতো না। বেঙ্গল টেনান্সি  আইন এখনও পর্যন্ত কার্যকর আছে। সেই ১৮৫৫ সাল নাড়িয়ে দিয়েছিলো ইংরেজদের।  শুরু হয়েছিলো স্বাধীনতার জন্য প্রথম সংগ্রাম। শিধু কানুর জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই ভবিষ্যতের দিশা হয়ে উঠে ছিলো। সেই সাঁওতাল বিদ্রোহ আজ ও স্বর্নাক্ষরে লেখা হয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *