কাহিনী  আবাহনী – কলমে বানীব্রত
কাহিনী  আবাহনী কলমে বানীব্রত তারিখ ২১/৯/২০ সাহাবুদ্দিন একজন মৃৎশিল্পী।      এক মেয়ে সাতাশ বছরের সাবানাকে নিয়ে তার সংসার। স্ত্রী রুবেলা ক্যান্সারে মারা যান। তারপর থেকেই সাহাবুদ্দিন  ঠাকুর বানানো  ছেড়ে দেন। অর্ডার এলেও নেন না। সংসার চালানো দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে  সাহাবুদ্দিন পরিবারের। ঠাকুর বানানোর জন্য সাবানা অনেক বলেও তার আব্বুকে রাজি করাতে পারেনি।  শরৎ কাল এলেই মনটা […]
কাহিনী  আবাহনী কলমে বানীব্রত তারিখ ২১/৯/২০ সাহাবুদ্দিন একজন মৃৎশিল্পী।      এক মেয়ে সাতাশ বছরের সাবানাকে নিয়ে তার সংসার। স্ত্রী রুবেলা ক্যান্সারে মারা যান। তারপর থেকেই সাহাবুদ্দিন  ঠাকুর বানানো  ছেড়ে দেন। অর্ডার এলেও নেন না। সংসার চালানো দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে  সাহাবুদ্দিন পরিবারের। ঠাকুর বানানোর জন্য সাবানা অনেক বলেও তার আব্বুকে রাজি করাতে পারেনি।  শরৎ কাল এলেই মনটা খারাপ হয়ে যায় সাবানার। এখন আর বাড়িতে ওর আব্বু ঠাকুর বানায় না। চার বছর হল না বিচুলি না বাঁশ পরে ওর বাড়ীতে। বাড়ীর শিউলি ফুলের গাছটা মাতিয়ে রাখে গন্ধে। পুরো উঠোনটা ভরে থাকে সাদা ফুলে। আনমনে  বসে থাকে সাবু। চোখে একরাশ হতাশা। মনটা থাকে ভারাক্রান্ত আর হবেই বা না কেন। এই সেই শিউলি ফোটার দিন আর আনন্দময়ীর আগমন বার্তা ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। সেই সময় সাবুর প্রেয়সীর যে বিদায় ঘটেছিল।     দিন যায় বছর যায়, জমানো টাকা পয়সাও শেষ হয়ে আসে। সাবানা ওর আব্বুকে কাজের জন্য জোর করতে পারে না। মা মারা যাবার দুবছর পর ওর পাড়ার এক দাদার হাত ধরে একটা কাজ যোগাড় করে সাবানা, আর তাই দিয়েই সংসার চালায়।  সাবুকে মেয়ের রোজগারের পয়সায় খেতে পড়তে হয় বলে মনে মনে কষ্টও পায় কিন্তু  বলতে পারেনা।     মাঠে কাশফুল ফুটেছে,  শিউলি গন্ধ ছড়িয়েছে চার দিকে।  সাবুর মনে পড়লো চার চারটে বছর আগে এই সময় রুবেলার চলে যাওয়ার কথা। বারান্দায় বসে এই কথাই ভাবছিল সাবু। এই সময় পাশের গ্রামের নবীন সংঘের ছেলেরা এসে হাজির।       সাবুকে অনেক করে ওদের ক্লাবের ঠাকুর বানানোর অনুরোধ করে। সাবু কিছুতেই  রাজি হয়না। বিগত তিন বছর সে কোনো ঠাকুরই বানায়নি তাই প্রথম বছর অনেকে এলেও পরবর্তী বছর গুলোতে আর কেউ আসে নি। তবে নবীন সংঘ প্রথমবার পুজো করছে,  অন্য কোথাও  দুর্গা ঠাকুর বানানোর ব্যবস্থা না হওয়ায় অবশেষে সাবুর কাছে আসা। অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর অবশেষে রাজি হয় সাবু৷ অগ্রিম অর্থ ধরিয়ে দিয়ে নবীন সংঘের ছেলেরা চলে যায়।    সারা রাত সাবু ভাবতে থাকে কিভাবে আবার কাজ শুরু করবে। মনের মাঝে এক যন্ত্রণা সব সময় নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। তবুও পরদিন সকালে সাবানা বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাবার পর সাবুও বাড়ী থেকে বের হয়। বাঁশ, কাঠ, খড় কিনে বাড়িতে রেখে আনতে যায় পতিতা পল্লির মাটি। কিন্তু সেখানে অনুমতি নিয়ে তবেই সে আনতে পারবে সেখানকার মাটি। পতিতা পল্লির আশপাশে ঘুরতে থাকে সাবুর চোখ। সাবানা দুর থেকে আব্বুকে দেখতে পেয়ে নিজেকে আড়াল করবার চেষ্টা করে। কিন্তু  সে চেষ্টাও বিফল হয়। সাবুর চোখে পড়ে যায় সাবানা। সাবু ভাবে "তার একমাত্র মেয়ে কিনা নিজেকে বিক্রি করে...... " না আর ভাবতে পারেনা সাবু।মেয়েকে কাছে ডাকে। লজ্জায় মাথা নিচু করে সাবানা আব্বুর সামনে এসে দাঁড়ায়। দু গাল বেয়ে গড়িয়ে পরে চোখের জল। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সাবু বলে, "আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। আমার অপদার্থতার জন্য তুই এভাবে রোজগার করে খাওয়াচ্ছিস আমাকে। বাবা মেয়ে দুজনেই চোখের জলে ভেসে যায়।"না মা আর তোকে আমি একাজে আসতে দেব না" বলে ওঠে সাবু।  আজ থেকে আমি আবার ঠাকুর বানানো শুরু করছি। কাল তোকে বলিনি যে পাশের গ্রামের নবীন সংঘের ছেলেরা অনেক করে বলে আমাকে রাজি করিয়েছে। সারারাত ভেবেছি তুই কষ্ট করে রোজগার করে আমাকে খাওয়াচ্ছিস আর আমি---নারে তারপর ঠিক করলাম আমি আবার ঠাকুর বানাবো আর তুই তোর মার মতো আমাকে সাহায্য করবি। ভেবেছিলাম তুই আজ বাড়ীতে ফিরে আবার বিচুলি কাঠ, বাঁশ দেখে আনন্দ পাবি। দেখ মার কী খেলা এখান কার মাটি নিতে এসে আমার মাকে দেখে ফেললাম।" সাবানা আব্বু বলে সাবুকে জড়িয়ে ধরে বলে, "আজ থেকে আমি তোমার সাথে প্রতিমা গড়ব। তুমি দাঁড়াও আমি এখানকার মাটি নিয়ে আসি।" এক ছুটে গিয়ে সাবানা মাটি নিয়ে এসে আব্বুর সামনে দাঁড়ায়। সাবু মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বলে , "আজ থেকে তোর নাম হবে আবাহনী। আর আমার হাতে আবার তৈরি হবে মা দুর্গা।"      সাবানা আব্বুকে জড়িয়ে ধরে নীল আকাশের বুকে হাল্কা সাদা মেঘের ভেসে যাওয়া দেখতে দেখতে কাশের বন পার করে, শিউলির গন্ধে মাতাল হয়ে বাড়ীতে ফেরে। তারপর বাপবেটিতে মিলে শুরু করে প্রতিমার রূপদান আর দূর থেকে ভেসে আসে  "বাজলো তোমার আলোর বেনু" গানটি।
Previousবৃষ্টি বিকেল – শ্রীজাত
Nextগদ্য কবিতা বৃদ্ধাশ্রম – কলমে  বানীব্রত